জীববিজ্ঞানের জানা অজানা

  

Click Read More...
সর্পবৃত্তান্ত : এক মধুর মিথ্যা রহস্য
ইংরেজি snake শব্দটি এসেছে প্রাচীন ইংরেজি sanca থেকে। সাপের ফরাসি নাম serpent এবং সংস্কৃত নাম সর্প।
শ্রেণীবিন্যাসগত অবস্থানঃ 
প্রাণী জগতের, কর্ডাটা পর্বের, Vertebrata (মেরুদণ্ডী) উপপর্বের, Sauropsida (সরোপ্সিডা) শ্রেণীর, Squamata বর্গের, Serpentes উপবর্গের সদস্যদের সাপ বলে। এখন পর্যন্ত যতোদূর জানা যায়, সাপের সর্বমোট ১৫টি পরিবার, ৪৫৬টি গণ, এবং ২,৯০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। 
উৎপত্তিঃ 
দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায় পাওয়া ১৫ কোটি বছরের পুরোনো নমুনা থেকে সাপের অস্তিত্ত্ব বোঝা যায়, যেটার গঠন বর্তমানকালের গিরগিটির মতো। তুলনামূলক শারীরস্থানবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে এ বিষয়ে সবাই একমত যে, গিরগিটি থেকেই সাপের উৎপত্তি। 
 বিস্তৃতিঃ 
উত্তর গোলাধের স্কান্ডিনেভিয়া থেকে দক্ষিণে একেবারে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এদের বসবাসের বিস্তৃতি। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সকল মহাদেশেই সাপের উপস্থিতি দেখা যায়, তা হতে পারে সমুদ্রের গভীরতম তলদেশে অথবা পর্বতের সুউচ্চ শানুদেশে প্রায় ষোলো হাজার ফিট (৪,৯০০ মি) ওপরে হিমালয় পর্বতমালাতেও। আবার আশ্চর্যের ব্যাপার এমন কিছু দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জ আছে যেখানে সাপের দেখা পাওয়া যায় না যেমন আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড । 
 আকারঃ 
কখনও খুব ছোট, ১০ সে.মি. (থ্রেড সাপ) থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫ ফুট বা ৭.৬ মিটার (অজগর ও অ্যানাকোন্ডা)। সম্প্রতি আবিষ্কৃত টাইটানোবোয়া (Titanoboa) সাপের জীবাশ্ম প্রায় ১৩ মিটার বা ৪৩ ফুট লম্বা। 
সর্পদংশন, মানুষের সাথে কি সাপের শত্রুতা? 
সাপকে কোনো কারণে উত্তেজিত করা না হলে বা সাপ আঘাতগ্রস্থ না হলে তারা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। প্রকৃতপক্ষে সাপ একটি নিরীহ প্রাণী। আবার অধিকাংশ সাপ বিষবিহীন, এদের কামড়ে মানুষের মৃত্যু ঘটার কোন সুযোগ নেই, তবে আতংকিত হয়ে হার্ট অ্যাটাকে অনেকের মৃত্যু ঘটে।  
সব সাপে কি বিষ আছে? 
না, বেশীরভাগ প্রজাতির সাপ বিষহীন এবং যেগুলো বিষধর সেগুলোও আত্মরক্ষার চেয়ে শিকার করার সময় বিভিন্ন প্রাণীকে ঘায়েল করতেই বিষের ব্যবহার বেশি করে।  
বিষধর সাপের দংশনে করণীয়ঃ 
সাপে কামড়ে মানুষ অনেক সময় আতঙ্কে মারা যান! কাউকে সাপে কামড় দিলে তাকে আশস্ত করতে হবে, আতঙ্ক মুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে! সাপে দংশন করার পর ৭/৮ ঘন্টা পর্যন্ত রোগী বেঁচে থাকে। বিষধর সাপ দংশনের লক্ষণগুলো হচ্ছে­ বমি, মাথাঘোরা, কামড়ানোর স্খানে ফোলা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, চোখে ডাবল দেখা, ঘাড়ের মাংসপেশী অবশ হয়ে ঘাড় পেছনের দিকে হেলে পড়া। এমন হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। হাসপাতালে নেয়ার আগে আক্রান্ত জায়গা নাড়াচাড়া করা যাবে না। হাত বা পায়ে কামড় দিলে হাতের পেছনের দিকে কাঠ বা বাঁশের চটা বা শক্ত জাতীয় কিছু জিনিস দিয়ে স্প্লিন্ট তৈরি করে বেঁধে দিতে হবে। বেশি টাইট করে বাঁধা যাবে না। বাঁধলে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়ে গ্যাংগ্রিন হতে পারে। মনে রাখতে হবে, বিষ শিরা দিয়ে নয়, লসিকাগ্রন্থি দিয়ে শরীরে ছড়ায়। রোগীকে ওঝা-বৈদ্য বা কবিরাজ না দেখিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিৎসার জন্য নিকটস্খ হাসপাতালে নিয়ে যেতে। দংশিত ব্যাক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সাহস দেয়া। 
 সাপের খাদ্য গ্রহণের বিশেষত্বঃ 
সাপ খাদ্যকে চিবিয়ে বা তুষে খেতে পারে না। এরা প্রথমে তাদের লালাগন্থ্রি থেকে নিঃসৃত লালা ( বিষ) দিয়ে শিকারকে অবশ করে বা মেরে ফেলে; কখনো কখনো পেছিয়ে ধরে শিকারকে হত্যা করে। এরপর খাবারকে গিলে ফেলে। 
বাড়ি থেকে সাপ তাড়ানোর উপায়ঃ 
বাজারে কার্বোলিক এসিড আছে, এগুলি বাড়িতে এনে বোতলসহ ঘরের মধ্যে রাখলে বাড়ি থেকে সাপ পালায়। ঘরে সাপ থাকার সম্ভাবনা থাকলে এবং ইদুরের গর্ত থাকলে শুকনা মরিচ আগুনে পোড়া দিন। 
সাপের খেলাঃ 
প্রথমেই বলি বাশির সুরে নাচার ব্যাপারে। সাপ কানে কোন শব্দ শোনে না। সুতরাং সাপুড়ের বাশির সুরে আসক্ত হওয়ার কোন কারন নেই। সাপুড়ের বাশির নড়াচড়ায় সে আত্বরক্ষার জন্য নিজেকে বাশির সাথে দোলাতে থাকে। এবার বলি তাবিজ বা গাছের শিকর দিয়ে সাপের মাথা নিচু করার খেলার ব্যাপারে। প্রথমে একটা সাপকে ধরে কয়েক দিন বাক্সে আটকে রাখলে সে কিছুটটা দুর্বল হয়ে পড়ে। তারপর সাপটিকে তাবিজের আকৃতির লোহার টুকরো আগুনে গরম করে বার বার সাপের মুখে ছেকা দেয়া হয়। এতে সাপ অসহ্য যন্ত্রনা পায়। বারবার এ ধরনের ক্রিয়ার পুনরাবৃত্তিতে সাপের মাঝে লোহার টুকরো বা অনুরূপ দেখতে তাবিজটি সাপেক্ষ উদ্দীপনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এ কারনে সাপুড়েরা যখন সাপ নিয়ে খেলা দেখায়, তখন বাক্সের স্যাকা দেওয়া সাপটির মুখে তাবিজ ধরলে সাপ তাবিজকে গরম লোহা মনে করে আত্বরক্ষা করতে মুখ লুকায়। 
নাগমনি বা সাপের মনিঃ 
নাগমনিধারী বিষধর সাপ ‘ইচ্ছাধারী’ অর্থাৎ যখন যেমন ইচ্ছা সেই রূপ ধরে! নাগমণির অলৌকিক ক্ষমতার বলে অন্ধ রাজকন্যা দৃষ্টি ফিরে পায়! মনির সংস্পর্শে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত রাজা সুস্থ হয়ে উঠেন! রত্নটি এতই ঝলমলে উজ্জ্বল, যে এর আশপাশ অমাবস্যা রাতের অন্ধকারেও আলোকিত হয়ে যায়! এমন কত কাহিনির সিনেমা আমরা দেখি। নাগমনি বিশ্বাসীরা মনে করেন, নাগমনি কমপক্ষে ১০০ বছর বয়সী বিষাক্ত সাপের মাথায় তৈরি হয়। অধিকাংশ সাপ ততদিন বাঁচে না। আর যে সাপের মাথায় মনি তৈরি শুরু হয়- তার পূর্ণতা পেতেও দীর্ঘসময় লাগে। ততদিনে এদের কেউ কেউ মানুষের শিকারে পরিণত হয়। তাই নাগমনিধারী সাপ খুবই দুর্লভ, দুর্গমতম পাগাড়-জঙ্গলে এদের বাস। এ কারণে চোখে পড়ে না! 
আধুনিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিষধর সাপ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তার বিষথলিটি শুকিয়ে ক্রমশ পাথরে পরিণত হয়। এর অবস্থান হয় সাপের মাথার পেছনে। অনেকের কাছে এটিই নাগমনি। সাপের বিষ জমে পাথর হয়ে যায় এবং এটি নিয়ে যারা পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন, তাদের মতে এই পাথর আলো ছড়ায় না এমনকি এর কোনো উজ্জ্বলতাও নেই। 
 
সুতরাং কল্পনার জগতের এ নাগমনি একটি রহস্যময় মিথ্যা। প্রাচীনকাল থেকে সাপ নিয়ে আমাদের কল্পনা একেছে নানান রংয়ের রঙীন আল্পনা, উপহার দিয়েছে কতশত রসদ আর রহস্যের গল্প আর সিনেমা। সত্যিই এ এক মধুর মিথ্যা রহস্য। 
 
--মো: তাজুল ইসলাম
বি.এস-সি (সম্মাান) ১ম শ্রেণি, এম.এস-সি (১ম শ্রেণি)
শিক্ষক ও লেখক

 

 উটের লোহিত রক্ত কনিকা নিউক্লিয়াসযুক্ত না নিউউক্লিয়াস বিহীন?
অস্থিমজ্জা থেকে উৎপন্ন হওয়ার সময় উটসহ সব স্তন্যপায়ীর রক্তের লোহিত রক্ত কনিকায় নিউক্লিয়াস থাকে, অর্থাৎ অপরিণত অবস্থায় নিউক্লিয়াস থাকে। কিন্তু পরিণত হওয়ার পূর্বে এতে এনিউক্লিয়েশন (enucleation) প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়, এসময় নিউক্লিয়াস অপসারিত হয়। উটসহ কোন স্তন্যপায়ীর রক্তের পরিণত লোহিত রক্ত কনিকায় নিউক্লিয়াস থাকে না। 
তবে অন্যান্য স্তন্যপায়ীর লোহিত রক্ত কনিকার সাথে উটের লোহিত রক্ত কনিকার পার্থক্য এই যে, অন্যান্য স্তন্যপায়ীর RBC গোলাকার কিন্তু উটের RBC ডিম্বাকার। ডিম্বাকার হওয়ায় ডিহাইড্রেশনের সময় উটের RBC অধিক ঘন রক্তের মধ্য দিয়ে সহজে প্রবাহিত হতে পারে। আবার পানিশুন্যতার সময় অন্যান্য স্তন্যপায়ীর RBC ১৫০ গুন পর্যন্ত প্রসারিত হলেও উটের RBC ২৪০ গুন পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে যা তাকে একসাথে অধিক পরিমান পানি পান করতে উদ্দীপনা যোগায়; এর ফলে একটি ৬০০ কেজি ওজনের উট ৩ মিনিটের মধ্যে ৫৩ গ্য্যালন পানি পান করতে পারে।
অর্থাৎ উটের পরিণত লোহিত রক্ত কনিকা নিউক্লিয়াসবিহীন এবং ডিম্বাকার (Ovale)। যেখানে অন্যান্য স্তন্যপায়ীর লোহিত রক্ত কনিকা নিউক্লিয়াসবিহীন এবং গোলাকার। নিউক্লিয়াসবিহীন লোহিত রক্ত কনিকা (Enucleated RBC) সকল স্তন্যপায়ীর বিবর্তনিক বৈশিষ্ট্য। তাই মিথ থেকে নেয়া কোন তথ্য গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
মানুষের ক্ষেত্রে ফিটাসে এবং নবজাতক শিশুর রক্তে নিউক্লিয়াসযুক্ত লোহিত রক্ত কনিকা দেখা যায়। যদি কখনো পরিণত মানুষের রক্তে নিউক্লিয়াসযুক্ত RBC দেখা যায় তাহলে তা অ্যানিমিয়া, অস্থি মজ্জ্বার আঘাত বা অস্থিমজ্জ্বার ক্যান্সার এর লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে; অর্থাৎ এটি খারাপ একটি লক্ষণ। নিউক্লিয়াসযুক্ত RBC দেখা যায় সরীসৃপ, পাখিসহ অন্যান্য নিম্নতর মেরুদণ্ডী প্রাণীতে।
এ বিষয়টি নিয়ে লেখার উদ্দেশ্য হলো বর্তমান উচ্চ মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান ২য় পত্র (প্রাণিবিজ্ঞান) বইয়ের সম্মাানীত লেখকদের মধ্যে এ ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে; যার ফলে বিভিন্ন বইতে দুই ধরণের তথ্যই উঠে এসেছে। তাই আশা করবো সকল বইতে এব্যাপারে একই ধরণের তথ্য আসবে, যা শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করবে না। 
 
--মো: তাজুল ইসলাম
বি.এস-সি (সম্মাান) ১ম শ্রেণি, এম.এস-সি (১ম শ্রেণি)
শিক্ষক ও লেখক
 

Popular posts from this blog

উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ক্লাসসমূহের লিংক (HSC Classes Link)

সেমিনার ও প্রেজেন্টেশন

ইউটিউব চ্যানেল [YouTube Channel]